ফ্রিল্যান্সিং জগতে এসইও (SEO) এখন সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতাগুলোর একটি। আর এসইও-র ভিত্তি হলো সঠিক কীওয়ার্ড রিসার্চ। ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইটে সঠিক ট্রাফিক আনার জন্য যে কীওয়ার্ডগুলো ব্যবহার করা হবে, সেগুলো যদি ভুল হয়, তাহলে পুরো পরিশ্রম পানিতে যেতে পারে। বাংলাদেশের অনেক ফ্রিল্যান্সার আছেন, যারা এসইও সার্ভিস দিতে চান, কিন্তু কীওয়ার্ড রিসার্চের সঠিক টুল বা পদ্ধতি জানেন না। আজকের আর্টিকেলে আমরা শিখব কীভাবে Google Keyword Planner freelance SEO Bangladesh প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে ক্লায়েন্টদের জন্য প্রফেশনাল মানের কীওয়ার্ড রিসার্চ করা যায়।
আমি নিজে যখন প্রথম ফ্রিল্যান্সিং শুরু করি, তখন কীওয়ার্ড রিসার্চ বলতে শুধু গুগলে কিছু টাইপ করে দেখতাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, আসল কাজ হলো ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। Google Keyword Planner এমন একটি ফ্রি টুল, যা আমাদেরকে সার্চ ভলিউম, প্রতিযোগিতা, এবং ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা দেয়। এই গাইডটি শেষ করলে আপনি নিজেই একটি ডেমো প্রজেক্টের জন্য কীওয়ার্ড রিসার্চ করে ফেলতে পারবেন।
১. Google Keyword Planner কী এবং কেন এটি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
Google Keyword Planner হলো গুগলের অফিসিয়াল একটি ফ্রি টুল, যা মূলত Google Ads-এর ক্যাম্পেইনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এসইও বিশেষজ্ঞরা এটিকে কীওয়ার্ড রিসার্চের জন্যও ব্যবহার করেন। টুলটি আপনাকে দেখায়: কোনো কীওয়ার্ডে মাসে কতবার সার্চ হয়, প্রতিযোগিতা কতটা, এবং প্রতি ক্লিকে আনুমানিক খরচ কত।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এই টুলটি বিশেষভাবে কার্যকর কারণ:
- ফ্রি: Google Ads অ্যাকাউন্ট খুললেই এটি ব্যবহার করা যায়, কোনো পেমেন্ট ছাড়াই।
- রিলায়েবল ডেটা: গুগলের নিজস্ব ডেটা, তাই অন্য অনেক টুলের চেয়ে নির্ভুল।
- লোকেশন টার্গেটিং: আপনি শুধু বাংলাদেশের ডেটা দেখতে পারেন, যা স্থানীয় ক্লায়েন্টদের জন্য দরকারি।
- কম্পিটিশন ইনসাইট: কোন কীওয়ার্ডে র্যাংক করা সহজ বা কঠিন, তা বুঝতে সাহায্য করে।
যখন আপনি একজন ক্লায়েন্টের জন্য এসইও করবেন, তখন আপনার প্রথম কাজ হবে তাদের ব্যবসা ও টার্গেট অডিয়েন্স বোঝা। Keyword Planner সেই বোঝাপড়াকে ডেটাতে রূপান্তরিত করে।
২. শুরু করার আগে: Google Ads অ্যাকাউন্ট সেটআপ
Google Keyword Planner ব্যবহার করতে হলে প্রথমে একটি Google Ads অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি চাইলে অ্যাকাউন্টটি তৈরি করে কোনো ক্যাম্পেইন চালাতে হবে না। শুধু টুলটি ব্যবহারের জন্যই অ্যাকাউন্ট রাখতে পারেন।
ধাপ ১: Google Ads-এ সাইন আপ
আপনার Gmail দিয়ে Google Ads-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে সাইন আপ করুন। প্রথমবার একটি ছোট ফর্ম পূরণ করতে হবে। দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সিলেক্ট করুন।
ধাপ ২: ক্যাম্পেইন তৈরি স্কিপ করুন
সাইন আপ করার পর গুগল আপনাকে একটি ক্যাম্পেইন তৈরি করতে বলবে। আপনি চাইলে “Expert mode” সিলেক্ট করে পরে “Skip” বাটনে ক্লিক করুন। এটি করলে আপনি সরাসরি ড্যাশবোর্ডে চলে যাবেন।
ধাপ ৩: Tools-এ যান
ড্যাশবোর্ডের উপরের মেনুতে “Tools” আইকনে ক্লিক করুন। সেখান থেকে “Planning” সেকশনে “Keyword Planner” সিলেক্ট করুন।
এই তিনটি ধাপ শেষ করলেই আপনি Keyword Planner-এর মূল স্ক্রিনে পৌঁছে যাবেন।
৩. কীওয়ার্ড আইডিয়া খোঁজা: “Discover new keywords” ব্যবহার
Keyword Planner-এ দুটি অপশন থাকে: “Discover new keywords” এবং “Get search volume and forecasts”। প্রথমটি নতুন কীওয়ার্ড আইডিয়া খোঁজার জন্য, আর দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট কীওয়ার্ডের ডেটা দেখার জন্য।
ধরা যাক, আপনার ক্লায়েন্ট একটি অনলাইন শপ যেখানে হ্যান্ডমেড জুতা বিক্রি হয়। আপনি “Discover new keywords” অপশনে ক্লিক করে কীভাবে কাজ করবেন:
- “Your product or service” ফিল্ডে লিখুন: handmade shoes বা leather shoes।
- “Your landing page” ফিল্ডে ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইট URL দিন।
- “Targeting” সেকশনে দেশ হিসেবে Bangladesh সিলেক্ট করুন।
- “Date range” এ শেষ ১২ মাস রাখুন।
- “Get results” বাটনে ক্লিক করুন।
এরপর আপনি একটি লিস্ট পাবেন যেখানে থাকবে কীওয়ার্ড, গড় মাসিক সার্চ, প্রতিযোগিতা, এবং অন্যান্য তথ্য। এই লিস্ট থেকে আপনি প্রাসঙ্গিক কীওয়ার্ডগুলো বেছে নিতে পারবেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: গুগল প্রায়ই দেখায় “কমপিটিশন” (Competition) — এটি বিজ্ঞাপনের প্রতিযোগিতা, জৈব (organic) প্রতিযোগিতা নয়। তাই কম কম্পিটিশন মানে এই নয় যে জৈব র্যাংকিং সহজ। তবুও এটি একটি ভালো সিগন্যাল।
৪. সার্চ ভলিউম ও ট্রেন্ড বিশ্লেষণ
কীওয়ার্ড আইডিয়া পাওয়ার পর আমাদের দেখতে হবে কোন কীওয়ার্ডগুলো আসলেই কাজে লাগবে। এখানে কয়েকটি মেট্রিক্স বুঝতে হবে:
গড় মাসিক সার্চ (Avg. monthly searches)
এটি নির্দেশ করে বাংলাদেশে (বা আপনার সিলেক্ট করা লোকেশনে) সেই কীওয়ার্ডটি মাসে কতবার সার্চ করা হয়। যেমন “handmade shoes” যদি ১,০০০ সার্চ পায়, আর “leather shoes” যদি ৩,০০০ পায়, তাহলে দ্বিতীয়টির সম্ভাবনা বেশি। তবে শুধু ভলিউম নয়, প্রাসঙ্গিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
কম্পিটিশন (Competition)
বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কতটা। কম থেকে মাঝারি হলে ভালো। কিন্তু মনে রাখবেন, জৈব এসইও-তে এই ডেটা সরাসরি প্রযোজ্য নয়।
ট্রেন্ড (Trend)
Keyword Planner-এ একটি গ্রাফ থাকে যা দেখায় বছরের কোন সময়ে সার্চ বেশি হয়। যেমন “winter shoes” বাংলাদেশে শীতের মাসগুলোতে বেশি সার্চ হতে পারে। এই ট্রেন্ড বুঝলে আপনি কনটেন্ট প্ল্যান করতে পারবেন।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি দেখেন “handmade shoes” সার্চ ভলিউম কম কিন্তু “handmade shoes bangladesh” সার্চ ভলিউম মাঝারি, তাহলে লং-টেইল কীওয়ার্ডটি টার্গেট করা ভালো। লং-টেইল কীওয়ার্ডে প্রতিযোগিতা কম থাকে এবং কনভার্সন রেট বেশি হয়।
৫. কীওয়ার্ড ফিল্টারিং ও প্রায়োরিটি নির্ধারণ
প্রচুর কীওয়ার্ড পাবেন, কিন্তু সবগুলো ব্যবহার করা সম্ভব নয়। সেখানেই দরকার ফিল্টারিং। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: প্রাসঙ্গিকতা যাচাই
প্রথমে সেই কীওয়ার্ডগুলো বাদ দিন যেগুলো আপনার ক্লায়েন্টের ব্যবসার সাথে মেলে না। যেমন “handmade shoes” এর সাথে “shoe polish” মিলবে না।
ধাপ ২: সার্চ ভলিউম অনুযায়ী সাজান
যে কীওয়ার্ডে সার্চ ভলিউম ১০-এর কম, সেগুলো সাধারণত বাদ দেওয়া ভালো (যদি না খুব স্পেসিফিক লং-টেইল হয়)।
ধাপ ৩: কম্পিটিশন ও CPC দেখুন
যদি CPC (Cost per Click) বেশি হয়, তার মানে সেই কীওয়ার্ডে বিজ্ঞাপনদাতারা বেশি বাজেট দিচ্ছে — এটি একটি ইঙ্গিত যে কীওয়ার্ডটি ভ্যালুয়েবল। কিন্তু জৈব র্যাংকিংয়ের জন্য বেশি CPC মানে বেশি প্রতিযোগিতা হতে পারে।
ধাপ ৪: কীওয়ার্ডের ইনটেন্ট বুঝুন
কীওয়ার্ডের পেছনে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য কী? যেমন “কিনতে চাই” (transactional) বনাম “কী?” (informational)। অনলাইন শপের জন্য ট্রানজেকশনাল কীওয়ার্ড বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ছোট টিপস: আপনি চাইলে কীওয়ার্ডগুলো একটি স্প্রেডশিটে রাখতে পারেন, যেখানে কলাম থাকবে — কীওয়ার্ড, সার্চ ভলিউম, কম্পিটিশন, CPC, এবং নোট। এতে ক্লায়েন্টকে রিপোর্ট দেখানো সহজ হবে।
৬. ক্লায়েন্টের জন্য কীওয়ার্ড রিপোর্ট তৈরি
ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আপনার কাজ শুধু ডেটা বের করা নয়, সেই ডেটা ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে বলা। একটি সুন্দর রিপোর্ট তৈরি করলে ক্লায়েন্ট আপনার উপর আস্থা রাখবে। রিপোর্টে যা যা থাকা উচিত:
- কীওয়ার্ডের তালিকা (টেবিল আকারে)
- প্রতিটি কীওয়ার্ডের সার্চ ভলিউম, কম্পিটিশন, CPC
- কোন কীওয়ার্ডে কনটেন্ট তৈরি করবেন (কনটেন্ট প্ল্যান)
- ট্রেন্ড গ্রাফ (যদি সম্ভব)
ধরা যাক, আপনার ক্লায়েন্ট একটি ফুড ব্লগ চালান। আপনি Keyword Planner দিয়ে “ঢাকার রেস্টুরেন্ট” এর মতো কীওয়ার্ড বের করলেন। রিপোর্টে দেখাবেন, এই কীওয়ার্ডে মাসে ৫০০ সার্চ হয়, কম্পিটিশন কম, তাই একটি ব্লগ পোস্ট লিখলে র্যাংকিংয়ের ভালো সুযোগ।
এছাড়া আপনি আমাদের রিসোর্স থেকে আরও কিছু ফ্রি টুলের আইডিয়া নিতে পারেন।
৭. সাধারণ ভুলগুলো এবং কীভাবে এড়ানো যায়
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে কিছু সাধারণ ভুল দেখা যায়:
শুধু ভলিউম দেখে কীওয়ার্ড বাছাই
অনেকে মনে করেন, যেটাতে সার্চ বেশি সেটাই সেরা। কিন্তু উচ্চ ভলিউমের কীওয়ার্ডে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। ছোট ব্লগ বা নতুন সাইটের জন্য লং-টেইল কীওয়ার্ড দিয়ে শুরু করা ভালো।
লোকেশন ফিল্টার না করা
ডিফল্টভাবে Keyword Planner সব দেশের ডেটা দেখায়। আপনি যদি বাংলাদেশের ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করেন, তাহলে অবশ্যই লোকেশন Bangladesh সেট করুন। নাহলে ভুল ডেটা পাবেন।
নেগেটিভ কীওয়ার্ড না দেখা
কখনও কখনও কিছু কীওয়ার্ড দেখতে একই রকম হলেও অর্থ ভিন্ন। যেমন “shoes” এবং “shoe rack” — দ্বিতীয়টি আপনার জুতার দোকানের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। তাই নেগেটিভ কীওয়ার্ডের তালিকাও তৈরি করুন।
এই ভুলগুলো এড়াতে পারলেই আপনার রিসার্চ আরও প্রফেশনাল হবে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
Google Keyword Planner কি সম্পূর্ণ ফ্রি?
হ্যাঁ, Google Keyword Planner ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ফ্রি। তবে এর জন্য একটি Google Ads অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। আপনি চাইলে কোনো বিজ্ঞাপন চালাতে হবে না, শুধু টুলটি ব্যবহার করতে পারেন।
কীওয়ার্ড প্ল্যানার থেকে পাওয়া সার্চ ভলিউম কি নির্ভুল?
গুগল সার্চ ভলিউম একটি আনুমানিক হিসাব। এটি নির্ভুল নয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাছাকাছি থাকে। অন্যান্য পেইড টুলের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন।
বাংলাদেশের লোকাল এসইও-তে কীওয়ার্ড প্ল্যানার কীভাবে কাজে লাগবে?
আপনি লোকেশন হিসেবে Bangladesh সিলেক্ট করলে, শুধু বাংলাদেশের সার্চ ডেটা পাবেন। এছাড়া আপনি সিটি বা ডিভিশনও সিলেক্ট করতে পারবেন, যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম। এটি লোকাল বিজনেসের জন্য খুবই কার্যকর।
ফ্রিল্যান্স এসইও প্রজেক্টে কীওয়ার্ড রিসার্চের জন্য কত সময় দেওয়া উচিত?
প্রজেক্টের আকারের উপর নির্ভর করে। ছোট প্রজেক্টে ২-৩ ঘণ্টা, আর বড় প্রজেক্টে ১-২ দিনও লাগতে পারে। তবে মনে রাখবেন, ভালো রিসার্চই সফল এসইও-র চাবিকাঠি।
কীওয়ার্ড প্ল্যানার ছাড়া অন্য কী কী টুল ব্যবহার করতে পারি?
আপনি Ubersuggest, Google Trends, বা Ahrefs-এর ফ্রি ভার্সন ব্যবহার করতে পারেন। তবে শুরুর দিকে Keyword Planner-ই যথেষ্ট।
শেষ কথা
Google Keyword Planner দিয়ে কীওয়ার্ড রিসার্চ করা শুধু একটি টেকনিক্যাল কাজ নয়, এটি একটি কৌশল। সঠিক কীওয়ার্ড বাছাই করতে পারলে আপনার ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইটে অর্গানিক ট্রাফিক বাড়বে, আর আপনার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারও এগিয়ে যাবে। আজই একটি ডেমো প্রজেক্ট নিয়ে চর্চা শুরু করুন। প্রথমে নিজের ব্লগ বা কোনো পরিচিতের সাইটের জন্য রিসার্চ করুন, তারপর ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করুন।
আরও জানতে চাইলে আমাদের ব্লগ ঘুরে দেখুন, অথবা এসইও কোর্সে ভর্তি হয়ে প্রফেশনাল দক্ষতা অর্জন করুন। আপনার সফলতা আমাদের গর্ব।


